Chapter 02- পৃথিবীর গতিসমূহ Prithibir Gotisomuho Geography Bhugol Subject WBBSE Class 9

আপনি এখানে শিখবেন এই অধ্যায়ে এবং বিষয়ের ফাউন্ডেশন অংশটা, এই বিষয়টিকে সহজ-সরলভাবে পড়িয়েছেন বিশেষজ্ঞ শিক্ষক ভিডিও লেকচার এর মাধ্যমে এবং এই পুরো অধ্যায়কে চার ভাগে খন্ডিত করে আপনার জন্য তৈরি করা হয়েছে

  • প্রথম খন্ডে আপনি শিখবেন ফাউন্ডেশন অংশটা যেখানে অধ্যায়ের ব্যাপারে আপনাকে বোঝানো হয়েছে তার মানে definitions,basics  গুলো সহজভাবে.  এবং এটাকে আপনি বুঝতে পারবেন যেটা আপনাকে পরীক্ষার জন্য ক্রীপের করতে সাহায্য করবে
  • দ্বিতীয় মডিউলে আপনি শিখবেন MCQ মাল্টিপল চয়েস কোশ্চেন যেটা সাধারণত এক Marks’er আসে পরীক্ষায়
  • তৃতীয় মডিউলে আপনি শিখবেন শর্ট অ্যানসার এবং কোয়েশ্চেন, যেটা আপনার পরীক্ষার সাজেশন মধ্যে পড়ে এবং এটা 3-4 marks’er  প্রশ্ন আসে আপনার পরীক্ষা
  • চতুর্থ মডিউল আপনি শিখবেন লং আনসার এবং questions যেটা সাধারণত 5-6 marks er হয়

আপনার যদি কোন প্রশ্ন থাকে তাহলে আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন যাতে কি আপনাকে আমরা সাহায্য করতে পারি

পৃথিবীর গতি

প্রাচীন কালের মানুষ বিশ্বাস করত পৃথিবী স্থির এবং সূর্য তার চারিদিকে ঘোরে । পরবর্তীতে আর্যভট্ট, কোপার্নিকাস এবং গ্যালিলিওর মত বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছিলেন যে, পৃথিবী সূর্যের চারদিকে একটি নির্দিষ্ট  গতিতে ঘুরছে।

এই মতবাদকে  বৈজ্ঞানিক ভিত্তির উপরসুপ্রতিষ্ঠিত করে স্যার আইজ্যাক নিউটন মত দেন যে, পৃথিবী নিজে অবিরাম ঘুরতে ঘুরতে একটি  নির্দিষ্ট পথে সূর্যের চারিদিকে প্রদক্ষিন করছে । সুতরাং পৃথিবীর দুটি গতি রয়েছে । যথা-

  1. আবর্তন গতি
  2. পরিক্রমন গতি

যে গতিতে পৃথিবী নিজে পাক খায় বা আবর্তন করে, সেই গতিকে বলে আবর্তন গতি ।

যে গতিতে পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে প্রদক্ষিন করে, সেই গতিকে পৃথিবীর পরিক্রমন গতি বলে ।

পৃথিবীসহ সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহের সূর্যকে পরিক্রমন

বর্তমানে আধুনিক  মহাকাশ গবেষণা প্রকাশ করেছে যে, পৃথিবী সহ সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহগুলি সূর্যের চারপাশে ঘুরতে থাকে ।

সৌরজগতের গ্রহগুলির গতির সময়কাল 

সারণীতে দেখানো হয়েছে, সৌরজগতের গ্রহগুলির মধ্যে শুক্রগ্রহ আবর্তন করতে সবচেয়ে বেশি সময় নিচ্ছে এবং বৃহস্পতিগ্রহ সবচেয়ে কম সময় নিচ্ছে । অন্যদিকে, সূর্যকে পরিক্রমনের সময় সবচেয়ে বেশি নেপচুন গ্রহের এবং সবথেকে কম বুধ গ্রহের । নিজের কক্ষপথে পরিক্রমনের গতিবেগ সবথেকে বেশি বুধ গ্রহের এবং সবথেকে কম নেপচুনে গ্রহের ।

পৃথিবীর গতি পর্যবেক্ষণ

প্রতিদিন সূর্য পূর্ব দিকে ওঠে এবং পশ্চিমে অস্ত যাওয়ার ঘটনাটি দেখে প্রাচীনকালের মানুষের ধারণা ছিল, পৃথিবী স্থির এবং সূর্য তার চারিদিকে অনবরত প্রদক্ষিণ করে চলেছে । প্রাচীন গ্রিক জ্যোর্তিবিজ্ঞানী ক্লডিয়াস টলেমিও বলেন যে “পৃথিবী স্থির আর সূর্যসহ যাবতীয় নক্ষত্রমন্ডলী পৃথিবীকে কেন্দ্র করে প্রদক্ষিণ  করে চলেছে” ।

চলমান একটি চলন্ত গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকালে মনে হয় যেন গাড়িটি থেমে গেছে এবং দুপাশের গাছপালা এবং অন্যান্য বস্তু ,পশুরা সবাই পিছনের দিকে ছুটে  চলেছে । এর থেকে প্রাচীনকালের লোকেরা এই উপসংহারে পৌঁছান যে সূর্য পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে চলেছে ।

ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানী আর্যভট্ট প্রথম এই প্রাচীন বিশ্বাসকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন এবং বলেছিলেন  “পৃথিবী স্থির নয় -বরং “গতিশীল” । পরবর্তীকালে অন্যান্য  জ্যোতির্বিজ্ঞানীরাও যেমন– কোপার্নিকাস, কেপলার, গ্যালিলিও এই ধারনাকে  সমর্থন করেছিলেন । স্যার আইজ্যাক নিউটন প্রমান করেন  যে ,পৃথিবী নিজের চারিদিকে ঘোরার সাথে সাথেও  সূর্যের চারদিকেও ঘোরে ।

নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ সূত্র অনুযায়ী, একটি বড় এবং ভারী বস্তু কখনই একটি ছোট এবং হালকা বস্তুর চারপাশে ঘুরতে পারে না । সূর্য পৃথিবীর চেয়ে প্রায় 13 লক্ষ গুণ বড় । ফলস্বরূপ, সূর্য পৃথিবীর চারপাশে প্রদক্ষিণ করতে পারে না । এর থেকে বলা যায় যে, পৃথিবী নিজেই সূর্যের চারদিকে ক্রমাগত ঘুরছে । অর্থাৎ পৃথিবীর দুটি গতি একই সঙ্গে কার্যকরী রয়েছে ।

শক্তিশালী টেলিস্কোপ ব্যবহার করে মহাকাশ পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে যে, সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহগুলিও সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে । ফলস্বরূপ, পৃথিবীকে সৌরজগতের একটি গ্রহ বলে ধরে নেওয়া হয় যেখানে পৃথিবীরও এই দুটি গতি রয়েছে।

ইউরি গ্যাগারিন, ভ্যালেন্তিনা  তেরেশকোভা, নিল আর্মস্ট্রং, রাকেশ শর্মা এবং সুনিতা উইলিয়ামস প্রমুখ মহাকাশচারীরা মহাকাশ থেকে পৃথিবীর আবর্তন গতি পর্যবেক্ষন  করেছিলেন ।

পৃথিবীর আবর্তন গতি 

আবর্তন গতি : একটি নির্দিষ্ট গতিতে পৃথিবী তার নিজের মেরুদন্ডের উপর পশ্চিম থেকে পূর্বে অবিরাম ঘুরে চলেছে । পৃথিবীর এই ঘূর্ণন গতিকেই আবর্তন  গতি বলা হয় । পৃথিবীর নিজের অক্ষের চারপাশে একটি সম্পূর্ণ ঘূর্ণন করতে প্রায় 24 ঘন্টা বা একদিন সময় লাগে, তাই এই গতিকে পৃথিবীর  দৈনিক গতিও বলা হয় । পৃথিবীর আবর্তনের ফলে দিনরাত্রি হয় তাই এই গতিকে আহ্নিক-গতিও বলা হয় ।

আবর্তনের সময় : সূর্যের সামনে পৃথিবীর অক্ষের চারপাশে একটি সম্পূর্ণ ঘূর্ণন সম্পন্ন করতে আনুমানিক 24 ঘন্টা সময় লাগে (এই 24 ঘন্টার মধ্যে, পৃথিবীতে প্রায়  প্রায় 12 ঘন্টা দিন এবং 12 ঘন্টা রাত মিলিয়ে একটি দিন সংঘটিত হয়) । এটি একটি সৌর দিবস হিসাবে উল্লেখ করা হয় ।

তবে সূর্যের পরিবর্তে কোন নক্ষত্রকে স্থির বিন্দু ধরে পৃথিবীর একটি পূর্ণ আবর্তনের সময় হল  23 ঘন্টা 56 মিনিট এবং 04 সেকেন্ড, একে নক্ষত্র দিন বলে ।

আবর্তনের দিক : পৃথিবী তার নিজস্ব অক্ষের উপর পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে ক্রমাগত ঘুরছে । তবে, পৃথিবী কেন পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে ঘুরছে তার কিছু পর্যবেক্ষণ এবং পরীক্ষা থেকে বোঝা যায় । সেগুলি হলো –

  1. সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত : সূর্য স্থির এবং পৃথিবী  তার মেরুদণ্ডের ওপর ক্রমাগত ঘুরছে বর্তমানে তা প্রমাণিত । কিন্তু পৃথিবী পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে আবর্তিত হওয়ার কারণে, সূর্য পূর্ব দিকে উদিত হয়  এবং পূর্বের দেশগুলিতে প্রথমে এবং  পশ্চিমের দেশগুলিতে পরে সূর্যোদয় হয় । পৃথিবী বিপরীত দিকে ঘুরলে পূর্ব দিকে সূর্যোদয় এবং পশ্চিম দিকে সূর্যাস্ত হত ।
  2. উপগ্রহ থেকে পর্যবেক্ষণ : সাম্প্রতিক বছরগুলিতে স্যাটেলাইট এবং মহাকাশযান দ্বারা মহাকাশের গৃহীত চিত্রগুলি দেখায় যে, পৃথিবী পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে ঘুরছে৷ এই তথ্যটি প্রমাণ করে যে, পৃথিবীর ঘূর্ণন পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে ।
  3. নিশ্চল বায়ুতে ওপর থেকে নীচের দিকে প্রস্তরখণ্ডের নিক্ষেপ :  যখন কোনো স্থানের বাতাস খুবই শান্ত থাকে তখন যদি অনেক উঁচু স্থান থেকে ভারী পাথর নিক্ষেপ করা হয়, তখন পাথরগুলো সোজা নিচে পড়ে না বরং কিছুটা পূর্ব দিক হয়েও পড়ে । পৃথিবী পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে ঘোরে বলেই  পাথরটি সামান্য পূর্বে পড়ে । ফ্রান্সের বুলোঁ এবং জার্মানির হামবুর্গে পরীক্ষাটি করা হয়েছিল ।
  1. বিজ্ঞানী ফুকোর পরীক্ষা : 1851 সালে একজন ফরাসি পদার্থবিদ লিয়ঁ ফুকো, ফ্রান্সের প্যারিসের প্যান্থিয়ান চার্চ থেকে একটি ৬১ -মিটার-লম্বা সরু তার ব্যবহার করে একটি লোহার বল পেন্ডুলাম  রূপে ঝুলিয়েছিলেন । পেন্ডুলামের নীচে একটি পিন রেখে মাটিতে এমনভাবে বালি ছড়িয়ে দিয়েছিলেন যাতে পেন্ডুলাম দুলতে থাকলে পিনের দাগ বালিতে পড়ে ।

তিনি পরবর্তীতে পেন্ডুলামটিকে উত্তর-দক্ষিণে কাত করে দেখেন যে পেন্ডুলামটি আগের মতো একই তালে দুলছে, কিন্তু বালির উপর পিন কাটা চিহ্নগুলি পশ্চিম থেকে পূর্বে ক্রমশ সরে যাচ্ছে । এটি প্রমাণ করে যে পৃথিবী পশ্চিম থেকে পূর্বে আবর্তন করে বলেই  বালির পিন পয়েন্টগুলি ধীরে ধীরে পূর্ব দিকে সরে যায় ।

আবর্তনের গতিবেগ : একটি নির্দিষ্ট গতিতে পৃথিবী তার অক্ষের চারিদিকে পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে আবর্তন করলেও পৃথিবীর আকৃতি অভিগত গোলাকার বলে পৃথিবীর সর্বত্র আবর্তনের গতিবেগ সমান নয় ।

যেমন – নিরক্ষীয় এলাকায়, পৃথিবীর আবর্তনের গতি প্রায় – ১৬৭০ কিমি/ঘন্টা ।

ক্রান্তীয় অঞ্চলে , পৃথিবীর আবর্তনের গতি প্রায় – ১৫৪০ কিমি/ঘন্টা ।

মেরুগুলির কাছাকাছি গ্রহের ঘূর্ণনের গতি প্রায় অস্তিত্বহীন বা নেই বললেই চলে ।

পৃথিবীর সর্বত্র আবর্তন গতি বেগ সমান হয় না কেন ?

পৃথিবীর আকৃতি অভিগত  গোলাকার বলে, বিষুবীয় অঞ্চলের পরিধি সবচেয়ে বেশি এবং মেরু অঞ্চলের সবচেয়ে কম । যদিও পৃথিবী নির্দিষ্ট গতিতে আবর্তন করে কিন্তু নিরক্ষীয় অঞ্চলে অধিক দূরত্ব অতিক্রম করায় পৃথিবীর আবর্তনের গতিবেগ এই অঞ্চলে অনেক বেশি হয় ।

বিষুব রেখা থেকে মেরু অঞ্চলে পৃথিবীর পরিধি কমে যাওয়ায় ঘূর্ণনের গতি কমে যায় । আবার, যেহেতু উভয় মেরুতে প্রসারণ খুবই কম, পৃথিবীর ঘূর্ণন গতি মূলত অস্তিত্বহীন ।

পৃথিবীর নিরক্ষীয় পরিধি প্রায় ৪০,০০০ কিমি এবং আবর্তন গতি প্রায় ১৬৭0 কিমি/ঘন্টা (40,000 কিমি / 24 ঘন্টা) । যেহেতু ক্রান্তীয় অঞ্চলে পৃথিবীর পরিধি  প্রায় 37,000 কিমি, তাই এই অঞ্চলে পৃথিবীর আবর্তন গতি প্রায় ১৫৪০ কিমি/ঘন্টা । এই হিসেবে পৃথিবীর আবর্তনের  গতিবেগ কিটো শহরে প্রায় ১৬৫০ কিমি/ঘন্টা । কলকাতায় প্রায় ১৫৩০ কিমি/ঘন্টা, লন্ডনে প্রায় ১০৫০ কিমি/ঘন্টা ।

সূর্যের আপাত দৈনিক গতি : আমরা সূর্যকে পূর্বদিকে উদিত এবং পশ্চিম দিকে আস্ত হতে দেখি কারণ পৃথিবী তার নিজের কক্ষপথে সূর্যের সামনে পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে আবর্তন করে । তাই মনে হয় সূর্যই যেন পৃথিবীর চারিদিকে আবর্তন করছে । প্রতিদিন সূর্যের আপাত অবস্থানের পরিবর্তনকে সূর্যের আপাত দৈনিক গতি বলা হয় ।

পৃথিবীর আবর্তন গতির ফলাফল 

  1. সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত : পৃথিবী পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে তার অক্ষের উপর আবর্তন করে বলে, প্রতিদিন পূর্বে সূর্যোদয় এবং পশ্চিমে সূর্যাস্ত ঘটে ।
  2. দিন ও রাত্রির সংঘটন : পৃথিবী সূর্যের সামনে পশ্চিম থেকে পূর্বে আবর্তন করার ফলে পৃথিবীর যে অংশটি সূর্যের সামনে আসে সেই দিকটা দিনের আলো পায় । এর বিপরীত অংশে সূর্যালোকের অভাবে রাত হয় । পৃথিবীতে দিনের অর্ধাংশ ও রাতের অর্ধাংশের বৃত্তাকার সীমারেখাকে ছায়াবৃত্ত বলে ।
  3. দিন ও রাত্রির বিভিন্ন অবস্থা :  সূর্যের সামনে পৃথিবীর ক্রমাগত  আবর্তনের ফলে দিন ও রাত্রির বিভিন্ন অবস্থা যেমন -সূর্যোদয়, ভোর, দুপুর, গোধূলি, সন্ধ্যা এবং মধ্যরাত্রি  প্রভৃতি পরিলক্ষিত হয় ।
  4.  নিয়তবায়ু ও সমুদ্রস্রোতের  দিকবিক্ষেপ : পৃথিবীর আবর্তনের ফলে কোরিওলিস বল সৃষ্টি হয় যা নিয়তবায়ু এবং সমুদ্রের স্রোতের দিকবিক্ষেপ ঘটায় । ফেরেলের সূত্র অনুসারে, নিয়ত বায়ুপ্রবাহ এবং সমুদ্রের স্রোত উত্তর গোলার্ধের ডানদিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধের বাম দিকে  বেঁকে যায়
  5. জোয়ার ভাটার সৃষ্টি : সৌরজগতের প্রতিটি নক্ষত্র একে অপরের প্রতি প্রবলভাবে আকৃষ্ট হয় । চাঁদ পৃথিবীর সবচেয়ে কাছের জ্যোতিষ্ক হওয়ায় চাঁদের আকর্ষণে পৃথিবীর সমুদ্রের জল স্ফীত হয় এবং জোয়ারের সৃষ্টি হয় । আবর্তনের ফলে পৃথিবীতে কোনো অংশে দিনে দুবার জোয়ার এবং দুবার ভাটা হয়।
  6. সময় নির্ণয় : পৃথিবীর একটি পূর্ণ আবর্তনে 24 ঘন্টা সময় লাগে । সময় গণনার জন্য এই সময়কালকে ঘণ্টায় ভাগ করে, তার এক ভাগকে ১ ঘন্টা, ১ ঘন্টাকে আবার ৬০ মিনিট এবং ১ মিনিটকে ৬০ সেকেন্ডে ভাগ করা হয় । ফলে, দিনে এবং রাতে উভয় সময়ের হিসেবে সুবিধা হয়েছে ।
  7. উদ্ভিদ ও প্রাণিজগতের সৃষ্টি : পৃথিবীর আবর্তনের ফলে পৃথিবীতে পরিমিত আলো এবং তাপ পাওয়া যায় । ফলস্বরূপ, পৃথিবী উদ্ভিদ এবং প্রাণীর বিকাশের জন্য অনুকূল পরিবেশের অধিকারী । যদি ঘূর্ণন গতি না থাকে, তাহলে পৃথিবীর এক অর্ধেকে অনির্দিষ্টকাল দিন থাকবে, আর বাকি অর্ধেক জায়গায় অনির্দিষ্টকাল রাত থাকবে । এর ফলে পৃথিবীতে কোন প্রাণ থাকবে না ।  আবর্তনের গতির জন্যই  গাছপালা এবং প্রাণীদের পৃথিবীতে বসবাস সম্ভবপর হয়েছে ।

পৃথিবীতে দিন ও রাতের সংঘটন : আবর্তন গতির কারণে পৃথিবীর যে অংশ সূর্যের সামনে আসে সেখানে সূর্যরশ্মি লম্বকিরণ দেওয়াই  দিন হয় । আর সূর্যের রশ্মি বিপরীত দিকে পৌঁছাতে না পারায় সেই অংশে রাত হয় । পৃথিবীর ক্রমাগত আবর্তনের কারণে, আলোকিত অঞ্চলটি ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে যায় এবং অন্ধকারাচ্ছন্ন অংশটি  সূর্যের সামনে আসে । ফলস্বরূপ, পৃথিবীর যে কোনও অংশে, দিনে প্রায় 12 ঘন্টা দিন এবং 12 ঘন্টা রাত হয় ।

পৃথিবীর দিন ও রাতের বিভিন্ন অবস্থা : পৃথিবীর আকৃতি গোলাকার বলে আবর্তনের কারণে পৃথিবীতে সূর্যোদয়, ভোর, দুপুর, গোধূলি, সন্ধ্যা এবং মধ্যরাতের মতো বিভিন্ন দিন ও রাতের অবস্থা পরিলক্ষিত হয়  ।

সারাদিনে কোনো  সময়ে কোনো একটি অংশে  দিন থাকে তার বিপরীত অংশে থাকে রাত । এই দিন ও রাত্রির মাঝামাঝি অংশে আলো এবং অন্ধকার একটি বৃত্তাকার সীমানায় মিলিত হয় ।

পৃথিবীতে দিনের অর্ধাংশ ও রাতের অর্ধাংশের বৃত্তাকার সীমারেখাকে ছায়াবৃত্ত বলে । আবর্তনের ফলে, পৃথিবীর যে অংশটি অন্ধকার থেকে আলোকিত অংশের দিকে চলে যায়, তখন সেই অংশে ভোর হয় । অন্যদিকে, সন্ধ্যা হয় যখন আলোকিত  অংশটি কেবল ছায়াবৃত্ত  অতিক্রম করে এবং অন্ধকারে প্রবেশ করে ।

উষা হল সূর্যোদয়ের ঠিক আগের আকাশে আবছা আলোর সময় । অন্যদিকে, গোধূলি হল সন্ধ্যার আগে আকাশে ক্ষীণ আলো যখন থাকে সেই সময়টা । যখন কোনো স্থানে যে সময়ে সূর্য ঠিক মাথার উপরে থাকে তখন হয় মধ্যাহ্ন । অন্যদিকে ঠিক সেই সময় হয় মধ্যরাত ।

কোরিওলিস বল

আবর্তন বল বা কোরিওলিস বল হল পৃথিবীর আবর্তন গতির কারণে সৃষ্ট বল । এই বল পৃথিবী থেকে সমস্ত বস্তুকে ছিটকে বের করার চেষ্টা করে । মাধ্যাকর্ষণ শক্তি এই বলকে এড়িয়ে পৃথিবীর পৃষ্ঠে জড় এবং জৈব উপাদান আটকে রাখে, কিন্তু বায়ু স্রোত, সমুদ্রস্রোত প্রভৃতি কোরিওলিস বলের দ্বারা বিক্ষিপ্ত হয় । এই বলের ক্রিয়ার ফলে তড়িৎ প্রবাহের দিক, সমুদ্রের স্রোত ইত্যাদি পরিবর্তন হয় ।

কোরিওলিস বলের প্রভাব : কোরিওলিস বলের ক্রিয়ায়, বায়ুর স্রোত এবং সমুদ্রের স্রোত পৃথিবীর পৃষ্ঠে সরাসরি উত্তর-দক্ষিণে প্রবাহিত হয় না, তবে উত্তর গোলার্ধে সামান্য ডানে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে সামান্য বাম দিক বেঁকে প্রবাহিত হয় ।

আবার এই বলের প্রভাবে নিয়ত বায়ুপ্রবাহ ( আয়ন বায়ু, পশ্চিমা বায়ু ও মেরু বায়ু ) যখন নিরক্ষরেখা অতিক্রম করে উত্তরে বা দক্ষিণে অগ্রসর হয় তখন তা বিপরীত দিকে বেঁকে প্রবাহিত হয় । উদাহরণ- বায়ু উত্তর গোলার্ধে বায়ু ডানদিকে বেঁকে যখন বিষুবরেখা অতিক্রম করে দক্ষিণ গোলার্ধে প্রবেশ করে তখন বাঁ দিকে প্রবাহিত হয় ।

ফেরেলের সূত্র : ফেরেলের সূত্র হলো, পৃথিবীর আবর্তন ঘটিত বল বা কোরিওলিস বলের প্রভাবে পৃথিবীপৃষ্ঠের নিয়ত বায়ুপ্রবাহসমূহ  উত্তর গোলার্ধে ডানদিকে (ঘড়ির কাঁটার দিকে) এবং দক্ষিণ গোলার্ধে বাম দিকে (ঘড়ির কাঁটার বিপরীতে) প্রবাহিত হয় । বিজ্ঞানী ফেরেল, সর্বপ্রথম এই সূত্রটি আবিষ্কার করেন বলেই এটি ফেরেলের সূত্র নাম পরিচিত ।

পৃথিবীর অক্ষের হেলানো অবস্থান

পৃথিবীর অক্ষের হেলানো অবস্থান : পৃথিবীর উত্তরে সুমের বিন্দু থেকে পৃথিবীর কেন্দ্র দিয়ে দক্ষিণে কুমেরু বিন্দু পর্যন্ত কাল্পনিক সরলরেখাটিকে পৃথবীর অক্ষ বা অক্ষরেখা বলে । পৃথিবী আবর্তন করে বলেই অক্ষরেখার সৃষ্টি হয় । পৃথিবীর অক্ষরেখাটিই হল তার মেরুরেখা । পৃথিবীর অক্ষ বা মেরু রেখা, পৃথিবীর কক্ষতলের সাথে  লম্ব নয় বরং লম্ব থেকে এটি ২৩১°২  কোণে ঝুঁকে পৃথবীর কক্ষতলের সাথে ৬৬১°২ কোণে হেলে অবস্থিত । ফলস্বরূপ, পৃথিবীর নিরক্ষীয় তলটিও ২৩১°২ কোণে পৃথিবীর কক্ষতলের  সাপেক্ষে হেলে আছে । অর্থাৎ পৃথিবীর অক্ষ বা মেরু রেখা সর্বদা পৃথিবীর কক্ষতলের সাপেক্ষে সর্বদা একই দিকে ৬৬১°২  কোণে হেলে থাকে ।

পৃথিবীর অক্ষের হেলানো অবস্থানের গুরুত্ব :  পৃথিবীর অক্ষ বা মেরু রেখা তার কক্ষতলের  সাথে ৬৬১°২   কোণে হেলে থাকার ফলে হয় –

  1. সূর্যের আপাত বার্ষিক গতি : পৃথিবীর মেরুরেখা তার কক্ষতলের সাথে ৬৬১°২   কোণে হেলে আছে বলেই, সূর্য বছরের অর্ধেক সময় ধরে সরাসরি উত্তরে (উত্তরায়ণ) এবং অর্ধেক সময় সরাসরি দক্ষিণে (দক্ষিনায়ন) সরে যেতে যেতে  উদিত হয় ও অস্ত যায় ।
  2. দিন-রাত্রির দৈর্ঘ্যের হ্রাস -বৃদ্ধি : পৃথিবীর মেরুরেখা কক্ষতলের সাথে সর্বদা ৬৬১°২ কোণে হেলে  সূর্যকে পরিক্রমের সময় যখন পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধ সূর্যের দিকে  ঝুঁকে পরে তখন উত্তর গোলার্ধে দিন বড়ো ও রাত ছোটো হয়, দক্ষিণ গোলার্ধে দিন ছোটো ও রাত বড়ো হয় । পৃথিবীর দক্ষিণ গোলার্ধ আবার যখন সূর্যের দিকে ঝুকে পরে তখন এর বিপরীত ঘটনা ঘটে ।
  3. মেরু অঞ্চলে একটানা ৬ মাস দিন ও ৬ মাস রাত্রির সৃষ্টি : পৃথিবীর মেরু রেখাটি তার কক্ষতলের  সাথে ৬৬১°২  কোণে হেলে অবস্থান করে তাই , যখন পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধ সূর্যের দিকে হেলে থাকে, তখন সেখানে অর্থাৎ সুমেরু অঞ্চলে ৬ মাস  একটানা দিন এবং কুমেরু অঞ্চলে ৬ মাস একটানা রাত থাকে । আবার যখন পৃথিবীর দক্ষিণ গোলার্ধ সূর্যের দিকে ঝুঁকে থাকে, তখন কুমেরু অঞ্চলে একটানা ৬ মাস দিন এবং সুমেরু অঞ্চলে ৬ মাস রাত্রি থাকে ।
  4. নিশীথ সূর্য : পৃথিবীর তার নিজের কক্ষপথে ৬৬১°২ কোণে হেলে থাকার কারণে, বছরের নির্দিষ্ট সময়ে পৃথিবীর মেরুগুলির মধ্যবর্তী অঞ্চলে অর্থাৎ মেরুবৃত্ত থেকে মেরুবিন্দু পর্যন্ত অঞ্চলে সূর্যকে দিনের 24 ঘন্টা আকাশে দেখা যায়, যা নিশীথসূর্য নামে পরিচিত । ফলস্বরূপ, পৃথিবীর উত্তর এবং দক্ষিণ গোলার্ধের এই দুটি অংশ “ নিশীথ সূর্যের দেশ” হিসাবে পরিচিত ।
  5.  বিপরীত ঋতুপর্যায় : পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধ যখন সূর্যের দিকে হেলে থাকে, তখন উত্তর গোলার্ধে গ্রীষ্ম এবং দক্ষিণ গোলার্ধে সাধারণত শীতকাল থাকে । যখন পৃথিবীর দক্ষিণ গোলার্ধ সূর্যের দিকে ঝুঁকে পড়ে, তখন দক্ষিণ গোলার্ধে গ্রীষ্মকাল এবং উত্তর গোলার্ধে শীতকাল হয় ।

পৃথিবীর পরিক্রমণ গতি 

পরিক্রমণ গতি :   বিজ্ঞানী স্ট্রলারের মতে ‘পৃথিবীর নিজ কক্ষে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করাই পৃথিবীর পরিক্রমণ গতি’ ।

পৃথিবী একটি নির্দিষ্টপথে তার নিজস্ব অক্ষ বা মেরুরেখার উপর, একটি নির্দিষ্ট দিকে এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ে সূর্যের চারপাশে প্রদক্ষিণ করে । পৃথিবীর এই গতিকে পরিক্রমণ গতি বলে ।

পৃথিবীর পরিক্রমণের পথ বা কক্ষপথ : পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণ করার সময় যে নির্দিষ্ট পথ অবলম্বন করে, সেই পথটি হলো পৃথিবীর কক্ষপথ । পৃথিবীর কক্ষপথটি উপবৃত্তাকার এবং এর পরিধি প্রায় ৯৬ কোটি কিলোমিটার । পৃথিবীর কক্ষপথটি যে সমতলে অবস্থান করে তাকে কক্ষতল বলে ।

পৃথিবীর কক্ষতলে  মেরুরেখার অবস্থান : পৃথিবীর মেরুরেখা  তার কক্ষতলের সাথে  লম্বভাবে অবস্থান না করে   ৬৬১°২  কোণে তির্যকে অবস্থান করে । তাই পৃথিবীর নিরক্ষীয় তলের  সাথে কক্ষতলের কৌণিক পরিমাপ হল ২৩১°২ । এর ফলে পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধ বছরের ৬ মাস সূর্যের দিকে এবং বাকি ৬ মাস দক্ষিণ গোলার্ধ সূর্যের দিকে ঝুঁকে থাকে ।

পৃথিবীর পরিক্রমণের দিক :  পৃথিবী সূর্যের চারদিকে পশ্চিম থেকে পূর্বে বা ঘড়ির কাঁটার বিপরীতে উপবৃত্তাকার কক্ষপথে পরিক্রমণ করে । পৃথিবীর উপবৃত্তাকার কক্ষপথের নাভিতে অবস্থান করে সূর্য । ফলে পরিক্রমণের সময় সূর্য ও পৃথিবীর মধ্যকার দূরত্ব সারা বছর সমান থাকে না ।

পৃথিবীররপরিক্রমণের সময় : সূর্যের একবার পূর্ণ পরিক্রমণ করতে পৃথিবীর সময় লাগে ৩৬৫  দিন ৫ ঘন্টা 48 মিনিট  ৪৬ সেকেন্ড । এটি একটি সৌর বছর হিসাবে উল্লেখ করা হয় । গণনার সহজতার জন্য, পৃথিবীর একটি সম্পূর্ণ পরিক্রমণের সময় ৩৬৫  দিন বা এক বছর ধরে নেওয়া হয় । যেহেতু পৃথিবী এই সময়ে একবার সূর্যকে পূর্ণ প্রদক্ষিণ করে তাই পরিক্রমণ গতিকে বার্ষিক গতিও বলা হয় ।

পরিক্রমণ গতির বেগ : পৃথিবীর পরিক্রমণ গতির বেগ প্রতি সেকেন্ডে প্রায় 30 কিলোমিটার ( প্রায় 1 লক্ষ  কিমি/ঘন্টা) । পৃথিবী তার কক্ষপথে একদিনে প্রায় ২৬ লক্ষ  কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে । সূর্য পৃথিবীর উপবৃত্তাকার কক্ষপথের নাভিতে অবস্থিত, তাই সূর্যের আকর্ষণে যখন পৃথিবী সূর্যের কাছাকাছি চলে আসে তখন পরিক্রমের বেগ বৃদ্ধি পায় এবং এর বিপরীতে পরিক্রমণের বেগ হ্রাস পায় যখন পৃথিবী সূর্য থেকে দূরে সরে যায় ।

পৃথিবীর পরিক্রমনগতি উল্লেখযোগ্য ফলাফল : 

অধিবর্ষ : পৃথিবী প্রতি ৩৬৫ দিন ৫ ঘন্টা ৪৮ মিনিট ৪৬ সেকেন্ডে সূর্যকে পূর্ণ পরিক্রমণ করে । এই সময়কাল সৌর বছর হিসাবে পরিচিত । যেহেতু এক বছর ৩৬৫ দিনে  হয়, তাই অতিরিক্ত  5 ঘন্টা 46 মিনিট 46 সেকেন্ড বা প্রায় ৬ ঘন্টা প্রতি বছর থেকে যায় ।

এই অতিরিক্ত সময় গণনা করার জন্য, প্রতি ৪ বছরে ফেব্রুয়ারিতে ১ দিন (৬ ঘন্টা x ৪ = ২৪ ঘন্টা বা ১ দিন) বাড়ানো হয় এবং সেই বছরটিকে ৩৬৬ দিনে ধরা হয় । এই বছরটি অধিবর্ষ হিসাবে পরিচিত । ৪ দ্বারা বিভাজ্য বছরগুলি অধিবর্ষ  হিসাবে বিবেচিত হয় ।

এভাবে পরিক্রমণের অতিরিক্ত সময়ের হিসাব মেলালেও, বছরে অতিরিক্ত সময় প্রায় ১১ মিনিট ১৪ সেকেন্ড (৬ ঘণ্টা – ৫ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট ৪৮ সেকেন্ড = ১১ মিনিট ১৪ সেকেন্ড) । এই অতিরিক্ত সময়ের ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য প্রতি ৪ শত বর্ষকে একটি অধিবর্ষ হিসাবে বিবেচনা করা হয় । অর্থাৎ, অধিবর্ষকে একইভাবে ৪০০ দ্বারা বিভাজ্য শতবর্ষকে অধিবর্ষ হিসাবে গণ্য করা হয় ।

পথিবীর অপসুর ও অনুসুর অবস্থান : সূর্য পৃথিবীর উপবৃত্তাকার কক্ষপথের নাভিতে অবস্থান করে । যদিও পৃথিবী এবং সূর্যের মধ্যে গড় দূরত্ব প্রায় ১৫ কোটি কিলোমিটার, তবে কক্ষপথ জুড়ে পৃথিবী এবং সূর্যের মধ্যে গড় দূরত্ব সারা বছর এক থাকে না কারণ সূর্যের অবস্থান কেন্দ্রে না থেকে এক দিকে সরে অবস্থান করে । বছরের কোনো এক সময়ে পৃথিবী সূর্যের কাছাকাছি চলে আসে, আর কোন সময়ে সূর্য থেকে দূরে সরে যায় ।

সূর্য ও পৃথিবীর মধ্যে দীর্ঘতম দূরত্ব হয় ৪ জুলাই । এই সময়ে সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্ব ১৫ কোটি ২০ লক্ষ কিমি হয়ে থাকে । এটি পৃথিবীর অপসূর অবস্থান নামে পরিচিত ।

৩ জানুয়ারি, সূর্য এবং পৃথিবীর মধ্যে দূরত্ব সবচেয়ে কম হয় । এই তারিখে পৃথিবী-সূর্যের দূরত্ব ১৪ কোটি ৭০ লক্ষ কিলোমিটার হয় । এটি পৃথিবীর অনূসূর  অবস্থান হিসাবে পরিচিত ।

সূর্য-পৃথিবীর দূরত্ব বৃদ্ধি ও হ্রাসের এই সময়ে, পৃথিবীর পরিক্রমণের গতিও পরিবর্তিত হয় । অপসূর অবস্থানে , সূর্য থেকে ক্রমবর্ধমান দূরত্বের কারণে পৃথিবীর পরিক্রমণ গতি কমে যায় । অনুসূর অবস্থানে, অন্যদিকে, পরিক্রমণ গতি বৃদ্ধি পায় ।

সূর্যের আপাত বার্ষিক গতি : বছরে একটা সময় সূর্য ধীরে ধীরে উত্তর দিকে এবং অপর সময় দক্ষিণ দিকে সরে গিয়ে উদিত হয় এবং অস্ত যায় । সূর্যের এই উত্তরদিক এবং দক্ষিণদিকের আপাত গতিকেই সূর্যের আপাত বার্ষিক গতি বলা হয় । সূর্যের আপাত বার্ষিক গতি পরিলক্ষিত হয়, ২২ ডিসেম্বর থেকে ২১ জুন সূর্যের উত্তর দিকে এবং ২১ জুন থেকে ২২ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় দক্ষিণ দিকে ।

যেহেতু পৃথিবীর মেরুরেখা তার কক্ষতলের সাথে ৬৬১°২ কোণে হেলে সূর্যকে পরিক্রমণ করে , তাই সূর্যের আপাত বার্ষিক গতি উত্তর গোলার্ধে কর্কটক্রান্তিরেখা এবং দক্ষিণ গোলার্ধে মকরক্রান্তি রেখার  মধ্যে সীমাবদ্ধ ।

সূর্যের আপাত বার্ষিক গতিপথ বা রবিমার্গ হল সেই পথ, যে পথ ধরে সূর্য সারাবছর উত্তরে বা দক্ষিণে চলাচল করে । সূর্যের আপাত বার্ষিক গতি পৃথিবীতে দিন ও রাতের দৈর্ঘ্যের পরিবর্তন ঘটায়এবং তাপমাত্রার পার্থক্য ঘটায় ।

উত্তরায়ণ ও দক্ষিণায়ন : সূর্যের আপাত গতির কারণে সূর্যকে উত্তরদিকে আবার কোনো সময়ে দক্ষিণ দিকে সরে উদিত ও অস্ত হতে দেখা যায় । 22 ডিসেম্বর থেকে 21 জুন পর্যন্ত, সূর্যের উত্তর দিকে আপাত গমন ঘটে । উত্তরায়ণ বলতে সূর্যের আপাত উত্তরমুখী যাত্রাকে বোঝায় । দক্ষিনায়ন বলতে 21 জুন থেকে 22 ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়কে বোঝায় যখন সূর্য দক্ষিণ দিকে গমন করে ।

পৃথিবীর দিন – রাত্রির দৈঘ্যের হ্রাস -বৃদ্ধি

পৃথিবীর দিন – রাত্রির দৈঘ্যের হ্রাস -বৃদ্ধি : সূর্যকে পরিক্রমের সময়-

  1. পৃথিবীর গোলাকার আকৃতি
  2. উপবৃত্তাকার কক্ষপথ
  3. পৃথিবীর আবর্তন এবং পরিক্রমণ গতি
  4. পৃথিবীর মেরুরেখা সর্বদা তার কক্ষতলের  সাথে ৬৬১°২ কোণে হেলে থাকে

এই প্রভৃতি কারণে, কখনও পৃথিবীর উত্তর আবার কখনও দক্ষিণ গোলার্ধ পর্যায়ক্রমে সূর্যের দিকে ঝুঁকে থাকে । ফলে পৃথিবীর দিন ও রাতের  দৈর্ঘ্য বাড়ে ও কমে । যেমন-

২১ মার্চ : ২১শে মার্চ, পৃথিবী তার কক্ষপথের একটি বিন্দুতে পৌঁছায় যখন সূর্যের রশ্মি বিষুব রেখার ওপর লম্বভাবে পড়ে । এই সময়ে সূর্য থেকে উত্তর ও দক্ষিণ মেরু সমান দূরত্বে থাকে, তাই সূর্যের রশ্মি পৃথিবীর উভয় গোলার্ধে সমানভাবে পড়ে । তাই এই দিনে পৃথিবীতে দিন এবং রাত সমান থাকে । এই দিনটি মহাবিষুব নামে পরিচিত ।

আবার এই দিনটি নসন্তকালীন বিষুব নামেও পরিচিত কারণ এই সময় উত্তর গোলার্ধে বসন্তকাল বিরাজ করে ।

২১শে মার্চের পর, পৃথিবী যখন তার কক্ষপথে চলতে থাকে, পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধ ধীরে ধীরে সূর্যের দিকে ঝুঁকতে থাকে । ফলস্বরূপ, দিনের দৈর্ঘ্য উত্তর গোলার্ধে ক্রমাগত বৃদ্ধি পায় এবং রাতের দৈর্ঘ্য কমতে থাকে তখন বিপরীত গোলার্ধে এর বিপরীত ঘটনা ঘটে ।

২১ শে জুন : ২১শে জুন, পৃথিবী তার কক্ষপথে এমন অবস্থানে আসে, যখন উত্তর গোলার্ধ সূর্যের দিকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকে পড়ে । সূর্যের রশ্মি এই সময়ে কর্কট ক্রান্তীয় অঞ্চলে লম্বভাবে পরে । ফলে, উত্তর গোলার্ধে, এটি দীর্ঘতম দিন এবং সবচেয়ে ছোট রাত এবং দক্ষিণ গোলার্ধে এর বিপরীত ঘটনা ঘটে । এই দিনটি কর্কটসংক্রান্তি নামে পরিচিত ।

এই দিনটি উত্তর অয়নান্ত দিবস হিসাবেও পরিচিত কারণ এই দিনে সূর্য উত্তরায়ণের শেষ সীমায় গিয়ে পৌঁছায় ।

21শে জুনের পর দক্ষিণ গোলার্ধ দক্ষিণ দিকে যাত্রা শুরু করে এবং সূর্যের রশ্মি ধীরে ধীরে কর্কটক্রান্তির দক্ষিণে চলে যায় । ফলস্বরূপ, উত্তর গোলার্ধে দিনের দৈর্ঘ্য ক্রমাগত হ্রাস পায় এবং রাতের দৈর্ঘ্য ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে । দক্ষিণ গোলার্ধে, বিপরীত ঘটনা ঘটে ।

 ২৩ সেপ্টেম্বর : ২৩ সেপ্টেম্বর তারিখে পৃথিবী তার কক্ষপথে এমন এক জায়গায় আসে যখন সূর্যের রশ্মি আবার বিষুব রেখায় লম্বভাবে পড়ে এবং পৃথিবীর উত্তর ও দক্ষিণ মেরু সূর্য থেকে সমান দূরত্বে থাকে, এই দিনে, পৃথিবীর সমস্ত অংশে দিন এবং রাত সমান হয় বলে এই দিনটিকে বলা হয়  জল বিষুব ।

এই দিনটি শারদ বিষুব নামেও পরিচিত কারণ এই সময় উত্তর গোলার্ধে শরৎকাল বিরাজ করে ।

২৩শে সেপ্টেম্বরের পরে, পৃথিবীর দক্ষিণ গোলার্ধ ধীরে ধীরে সূর্যের দিকে ঝুঁকে পড়ে । ফলস্বরূপ, দক্ষিণ গোলার্ধে দিনের দৈর্ঘ্য ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে এবং রাতের দৈর্ঘ্য দক্ষিণ গোলার্ধে ধীরে ধীরে হ্রাস পায় । উত্তর গোলার্ধে বিপরীত অবস্থা বিরাজমান ।

২২ ডিসেম্বর : পরিক্রমনকালে ২২ ডিসেম্বর তারিখে পৃথিবী এমন এক অবস্থানে পৌছায় যখন পৃথিবীর দক্ষিণ গোলার্ধ সূর্যের দিকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকে থাকে এবং সূর্যেররশ্মি মকরক্রান্তি রেখার উপর লম্বভাবে কিরণ দেয় । ফলস্বরূপ, এই দিনটি দক্ষিণ গোলার্ধে দীর্ঘতম দিন এবং রাত সবচেয়ে ছোট হয় ।  উত্তর গোলার্ধে এর বিপরীত ঘটনা ঘটে । এই দিনটিকে  মকরসংক্রান্তি  বলে ।

এই দিনে সূর্য দক্ষিণায়ণের শেষ সীমায় পৌঁছোয় বলে এই দিনটি দক্ষিণ অয়নান্ত দিবস নামেও পরিচিত ।

নিশীথ সূর্য ও নিশীথ সূর্যের দেশ :  কোনো স্থানের স্থানীয় সময় অনুযায়ী রাত ১২টায় আকাশে সূর্য দেখা গেলে সেই সময়কার সূর্যকে নিশীথ সূর্য বলা হয় এবং  সেই স্থানটিকে নিশীথ সূর্যের দেশ বলা হয় ।

পৃথিবী নিজের কক্ষে ৬৬১°২  ডিগ্রি কোণে সূর্যকে পরিক্রমণের কারণে, বছরের একটি সময়ে পৃথিবীর মেরুবৃত্ত থেকে মেরুবিন্দু  পর্যন্ত অঞ্চলে সূর্যকে 24 ঘন্টা আকাশে দেখা যায়, একে নিশীথ সূর্য বলে ।

ইউরোপের নরওয়ের  হ্যামারফেস্ট পোর্ট নিশীথ  সূর্যের দেশ হিসাবে পরিচিত । মে মাসের মাঝামাঝি থেকে জুলাই পর্যন্ত এখানে নিশীথ সূর্য দেখা যায় ।

মেরুপ্রভা বা মেরুজ্যোতি : পৃথিবীর মেরুরেখা তার কক্ষতলের  সাথে ৬৬১°২ কোণে হেলে থাকায় সূর্যের লম্বরশ্মি ক্রান্তীয় বৃত্তরেখা অতিক্রম করে মেরুবৃত্তের দিকে যেতে পারে না ।

ফলস্বরূপ, ২১ মার্চ থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সুমেরু অঞ্চলে ৬ মাস একটানা দিন এবং কুমেরু অঞ্চলে একটানা ৬ মাস রাত থাকে । আবার, ২৩শে সেপ্টেম্বর থেকে ২১শে মার্চ পর্যন্ত, কুমেরু অঞ্চলে টানা ৬ মাস  দিন এবং সুমেরু অঞ্চলে ৬ মাস  রাত দেখতে পাওয়া যায় ।

সুমেরু এবং কুমেরু অঞ্চলে ৬ মাস একটানা রাতের সময়, আয়নমণ্ডলে তড়িদাহত অণুর চৌম্বকবিক্ষেপের ফলে বায়ু কণাগুলিতে ইলেকট্রনের আধিক্যে এক ধরনের মৃদু আলোকরশ্মির সৃষ্টি করে । যখন আলোর এই রশ্মি মেরু অঞ্চলের বরফের উপর প্রতিফলিত হয়, তখন এটি একটি উজ্জ্বল রামধনুর   মত ম্লান আলোর ছটা দেখা যায় । এটি মেরুজ্যোতি বা অরোরা নামে পরিচিত ।

সুমেরু অঞ্চলে একটানা ৬ মাস রাতের সময় যে মেরুজ্যোতির বা অরোরা আবির্ভাব হয় তা সুমেরু প্রভা বা অরোরা বোরিওলিস এবং কুমেরু অঞ্চলে একটানা ৬ মাস রাত থাকায় এই মেরুজ্যোতি কুমেরু প্রভা বা অস্ট্রালিস নামে পরিচিত ।

ঋতু পরিবর্তন

ঋতু পরিবর্তন : পৃথিবীতে  দিন এবং রাতের হ্রাস বৃদ্ধির কারণে পৃথিবীর পৃষ্ঠ জুড়ে তাপমাত্রার পার্থক্য ঘটে । তাপমাত্রার পার্থক্যের উপর ভিত্তি করে একটি বছরকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা যায় । এই প্রতিটি বিভাগ একটি ঋতু হিসাবে উল্লেখিত । ঋতু পরিবর্তন বলতে পৃথিবীর বিভিন্ন রিতুর পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তন বোঝায় ।

বিশ্বের অনেক জায়গায় চারটি প্রধান ঋতু দেখা যায় :

  1. গ্রীষ্মকাল
  2. শরৎকাল
  3. শীতকাল
  4. বসন্তকাল

এই চারটি ঋতু সাধারণত প্রতি তিন মাসে পরিবর্তিত হয় । যেমন-

উত্তর গোলার্ধে গ্রীষ্মকাল ও দক্ষিণ গোলার্ধে শীতকাল : ২১ শে জুন তারিখে সূর্য উত্তর গোলার্ধের কর্কটক্রান্তি রেখার উপর লম্বভাবে কিরণ দেয় । ফলস্বরূপ, উত্তর গোলার্ধে এই সময়ে সবচেয়ে দীর্ঘতম দিন এবং সবচেয়ে ছোট রাত থাকে, তখন  দক্ষিণ গোলার্ধে বিপরীত ঘটনা ঘটে।

এই কারণে উত্তর গোলার্ধে ২১শে জুনের দেড় মাস আগে থেকে দেড় মাস পর পর্যন্ত উষ্ণতার পরিমাণ বেশি থাকায় এখানে গ্রীষ্মকাল থাকে । এই সময় দক্ষিণ গোলার্ধে রাতের দৈর্ঘ্য কোন থাকায় উষ্ণতার পরিমাণ কম হয় তাই  দক্ষিণ গোলার্ধ জুড়ে শীতকাল বিরাজ করে ।

উত্তর গোলার্ধে শরৎকাল ও দক্ষিণ গোলার্ধে বসন্তকাল :  ২১শে জুনের পর থেকে সূর্যের দক্ষিণায়ণ শুরু হওয়ায় সূর্যরশ্মি ক্রমশ কর্কটক্রান্তি রেখার দক্ষিণে শর্তে থাকে । ২৩শে সেপ্টেম্বর, সূর্যের রশ্মি বিষুব রেখায় লম্বভাবে পড়ে । ফলস্বরূপ, পৃথিবীর সমস্ত স্থানে, দিন এবং রাত সমান হয় এবং সমতাপ বজায় থাকে । তাপমাত্রার কোনো পার্থক্য না থাকায় এখানে আরামদায়ক অবস্থা বিরাজ করে ।

ফলত, ২৩ সেপ্টেম্বর তারিখের দেড় মাস আগে থেকে দেড় মাস পর পর্যন্ত সময়ে উত্তর গোলার্ধে শরৎকাল  দক্ষিণ গোলার্ধে বসন্তকাল বিরাজ করে ।

উত্তর গোলার্ধে শীতকাল ও দক্ষিণ গোলার্ধে গ্রীষ্মকাল :   ২৩ সেপ্টেম্বরের পর সূর্যের দিকে ক্রমশ পৃথিবীর দক্ষিণ গোলার্ধ ঝুঁকতে থাকে , ফলে উত্তর গোলার্ধে দিনের দৈর্ঘ্য ধীরে ধীরে হ্রাস পায় যখন রাতের  দৈর্ঘ্য ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে এর বিপরীত ঘটনা ঘটে ।

22 ডিসেম্বরে সূর্যেররশ্মি মকরক্রান্তি রেখায় লম্ব লম্ব কিরণ দেয় । ফলস্বরূপ, উত্তর গোলার্ধে এই সময়ে সবচেয়ে দীর্ঘ রাত এবং সবচেয়ে ছোট দিন থাকে, যেখানে দক্ষিণ গোলার্ধে এর বিপরীত অবস্থার সৃষ্টি হয় । তাই 22শে ডিসেম্বরের তারিখের দেড় মাস আগে থেকে দেড় মাস পর পর্যন্ত সময়ে উত্তর গোলার্ধে শীতকাল দক্ষিণ গোলার্ধে  গ্রীষ্মকাল  বিরাজ করে ।

উত্তর গৌলার্ধে বসন্তকাল ও দক্ষিণ গোলার্ধে শরৎকাল :  22শে ডিসেম্বরের পর সূর্যের উত্তরায়ণ শুরু হলে সূর্যরশ্মি ধীরে ধীরে মকরক্রান্তি রেখার  উত্তর দিকে চলে যায় । ২১শে মার্চ, সূর্যের রশ্মি পুনরায় বিষুবরেখায় লম্বভাবে পড়ে । ফলে পৃথিবীর সব অঞ্চলে দিন ও রাত সমান হওয়ায় সমভাবাপন্ন উষ্ণতা থাকে ।

তাই ২১শে মার্চের দেড় মাস আগে থেকে দেড় মাস পর পর্যন্ত সময়ে উত্তর গোলার্ধে বসন্ত আসে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে শরৎ আসে ।

এইভাবে, পৃথিবীর চারটি প্রধান ঋতু নিয়মিতভাবে পরিবর্তিত হয় । বিশ্বের বর্ষাকালীন দেশগুলিতে গ্রীষ্মের শেষের দিকে যথেষ্ট বৃষ্টিপাতের কারণে, বর্ষাকাল এবং শীত ঋতুর আগে  হালকা শীতভাব বজায় রাখার জন্য হেমন্তকাল – এই দুটি পৃথক ঋতুর আবির্ভাব ঘটে ।

ঋতুচক্র :  বিশ্বের চারটি প্রধান ঋতু যথা-গ্রীষ্ম, শরৎ, শীত এবং বসন্তকালের  পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তন চক্রকে ঋতুচক্র বলা হয় ।

ঋতু পরিবর্তনহীন অঞ্চল : যদিও ঋতু পরিবর্তনের সাধারণ নিয়ম সারা বিশ্বে বিদ্যমান, তবুও পৃথিবীর নিরক্ষীয় অঞ্চলে বা মেরু অঞ্চলে ঋতু পরিবর্তন হয় না বললেই চলে । নিরক্ষীয় অঞ্চলে সূর্যের রশ্মি সারা বছর লম্বভাবে বিকিরণ করে, যার ফলে এই অঞ্চলের সবচেয়ে আর্দ্র গ্রীষ্ম হয় । আবার প্রচণ্ড ঠান্ডার কারণে পৃথিবীর উভয় মেরু অঞ্চলেই সারা বছর শুষ্ক শীত বিরাজ করে ।

মানবজীবনে পৃথিবীর গতির প্রভাব

মানবজীবনে পৃথিবীর গতির প্রভাব : পৃথিবীর আবর্তন এবং পরিক্রমন  গতির কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে আলো ও তাপ ভিন্ন হয় এবং সময়ের তারতম্য ঘটে । ফলস্বরূপ, পৃথিবীর  তাপমাত্রা এবং উদ্ভিদের তারতম্যের প্রভাবে মানুষের বাসস্থান, পোশাক, দৈনন্দিন কাজকর্ম এবং এমনকি আচরণের উপর প্রভাব ফেলে । এছাড়াও, বাহ্যিক প্রাকৃতিক শক্তি যেমন বায়ু, বৃষ্টি, সমুদ্রস্রোত ইত্যাদি পৃথিবীর দুটি গতিবিধির জন্য দায়ী । সর্বোপরি, এই দুটি গতির কারণেই আমরা পৃথিবীতে জীবনধারণ করতে সক্ষম হয়েছি ।

আবর্তন গতি ও পরিক্রমণ গতির পার্থক্য : 

আবর্তন গতিপরিক্রমন গতি
১। পৃথিবী তার নিজের অক্ষের চারিদিকে পশ্চিম থকে পূর্বে অবিরাম পাক খাওয়ার গতিকে বলা হয় আবর্তন গতি

২। পৃথিবী তার অক্ষের চারিদিকে একবার পূর্ন আবর্তন করতে সময় নেয় ২৪ ঘন্টা ৫৬ মিনিট  ০৪ সেকেন্ড বা প্রায় ২৪ ঘন্টা । একে সৌরদিন বলে ।

৩। আবর্তন  গতির সময়ে আপাতদৃষ্টিতে সূর্যকে পূর্ব থকে পশ্চিমে সরতে দেখা যায় । একে সূর্যের আপাত দৈনিক গতি বলে ।

৪। আবর্তন  গতির ফলে পৃথিবীতে পর্যায়ক্রমে দিন-রাত্রি সংঘটিত হয় ।

৫। আবর্তন  গতির ফলে পৃথিবীতে বায়ুপ্রবাহ ও সমুদ্রস্রোতের দিকবিক্ষেপ ঘটে ।

.১। পৃথিবী তার নিজস্ব অক্ষ বা মেরুর চারপাশে একটি নির্দিষ্টপথে, একটি নির্দিষ্ট দিকে এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ে সূর্যের চারপাশে ঘোরে । পৃথিবীর এই গতিকে পরিক্রমণ গতি বলে ।

২। উপবৃত্তাকার কক্ষপথে সূর্যকে একবার পূর্ণ  পরিক্রমণ করতে পৃথিবির সময় লাগে ৩৬৫ দিন ০৫ ঘন্টা ৪৮ মিনিট  ৪৬ সেকেন্ড । একে সৌরবছর বলে ।

৩। পরিক্রমন গতির সময়ে আপাতদৃষ্টিতে সূর্যকে উত্তরদিকে বা দক্ষিণ দিকে সরতে দেখা যায় । একে সূর্যের আপাত বার্ষিক গতি বলে ।

৪। পরিক্রমণ গতির ফলে পৃথিবীতে বছরের বিভিন্ন সময়ে দিন-রাত্রির দৈর্ঘ্যের হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে ।

৫। পরিক্রমণ গতির ফলে পৃথিবীতে দিন-রাত্রির দৈর্ঘ্যের হ্রাস-বৃদ্ধির কারণে উত্তাপের তারতম্য ঘটে ও এর ফলে পৃথিবীতে ঋতু পরিবর্তন হয় ।

SOLVED QUESTIONS & ANSWERS of পৃথিবীর গতিসমূহ PRITHIBIR GOTISOMUHO

1 MARKS QUESTIONS of পৃথিবীর গতিসমূহ PRITHIBIR GOTISOMUHO

1. বিষুব অর্থ কী?
Ans. সমান।

2. ‘অরোরা অস্ট্রালিস’ কোথায় দেখা যায়?
Ans. দক্ষিণমেরুতে।

3. আবর্তনের ফলে গতিশীল পদার্থের গতিবিক্ষেপ হয়— এই সুত্রটি কে আবিষ্কার করেন?
Ans. কোরিওলিস, 1835 সালে।

4. কোন্ দিন পৃথিবী ও সূর্যের মধ্যে দূরত্ব সবচেয়ে কম হয়?
Ans. 3 জানুয়ারি।

5. পৃথিবীর কোন্ গতির ফলে দিনরাত্রি হয়?
Ans. আবর্তন গতি।

6. পৃথিবীতে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত হওয়ার প্রকৃত কারণ কী?
Ans. পৃথিবীর আবর্তন।

7. পৃথিবীর আবর্তন গতি না থাকলে কত দিন অন্তর কোনো স্থানে পৃথিবীতে জোয়ারভাটা হত?
Ans. 273 দিন অন্তর।

8. পৃথিবীর আলোকিত ও অন্ধকার অর্ধাংশ যে বৃত্তাকার সীমারেখায় মিলিত হয় তাকে কী বলে?
Ans. ছায়াবৃত্ত।

Multiple Choice Questions – 1 Marks of পৃথিবীর গতিসমূহ PRITHIBIR GOTISOMUHO

1. অনুসূর অবস্থানে সূর্য ও পৃথিবীর মধ্যে দুরত্ব থাকে—
A. 15 কোটি কিমি B. 14 কোটি কিমি C. 15.20 কোটি কিমি D. 14.70 কোটি কিমি
Ans. D

2. অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশে গ্রীষ্মকাল শুরু হয়-
A. জুন মাসে B. জুলাই মাসে C. ডিসেম্বর মাসে D. সেপ্টেম্বর মাসে
Ans. C

3. উত্তর গোলার্ধে দীর্ঘতম রাত্রি হয়—
A. 21 মার্চ B. 23 সেপ্টেম্বর C. 21 জুলাই D. 22 ডিসেম্বর
Ans. D

4. বুধের একবার আবর্তনে সময় লাগে—
A. 55 ঘণ্টা B. 58 ঘণ্টা C. 58 দিন 15 ঘণ্টা D. 59 দিন
Ans. C

5. অধিবর্ষে সামগ্রিক বছরটি হল—
A. 363 দিন B. 364 দিন C. 365 দিন D. 366 দিন
Ans. D

6. সারাবছরই প্রায় দিনরাত্রি সমান—
A. নিরক্ষীয় অঞ্চলে B. সুমেরু অঞ্চলে C. কুমেরু অঞ্চলে D. মধ্য অক্ষাংশীয় অঞ্চলে
Ans. A

7. কলকাতায় পৃথিবীর আবর্তন বেগ ঘণ্টায় –
A. 1547 কিমি B. 1674 কিমি C. 0 কিমি D. 666 কিমি
Ans. A

8. পৃথিবীর অনুসূর অবস্থানের দিনটি হল—
A. 3 জানুয়ারি B. 4 জানুয়ারি C. 21 মার্চ D. 23 সেপ্টেম্বর
Ans. A

9. মকরসংক্রান্তিতে মকরক্রান্তিরেখায় সূর্যরশ্মির সর্বাধিক পতনকোণ হয়—
A. 90° B. 66.5° C. 47° D. 43°
Ans. A

10. পৃথিবীর গতির সংখ্যা—
A. একটি B. দুটি C. তিনটি D. চারটি
Ans. B

Short Questions – 2-3 Marks of পৃথিবীর গতিসমূহ PRITHIBIR GOTISOMUHO

Long Questions – 5 Marks of পৃথিবীর গতিসমূহ PRITHIBIR GOTISOMUHO

error: Content is protected !!
Scroll to Top

আজকেই কেনো পরীক্ষার শর্ট নোটস

এখন সহজে পরীক্ষার প্রস্তুতি নাও – আজকেই ডাউনলোড করো পিডিএফ বা বই অর্ডার করো আমাজন বা ফ্লিপকার্ট থেকে